বাঁশের রাজত্বে ভেলাখুম।

বর্তমান বাংলাদেশের যেসব খুম আলো ছড়াচ্ছে তাদের মধ্যে সব চেয়ে সুন্দর থানাচি উপজেলার ন্যাইখ্যাংছড়ির ভেলাখুম। দুই পাশে কালো পাথরের বিশাল দেওয়াল আর মাঝে বিশাল চৌবাচ্চা। তাতে জমে আছে সাতভাই খুম থেকে নেমে আসা স্বচ্ছ নীল জল। বাহন কেবলই বাঁশের ভেলা।

ভেলাখুম জলপ্রপাত কোথায়ঃ

ভেলাখুম জলপ্রপাত বাংলাদেশের বান্দরবান জেলার থানচি উপজেলায় বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে দুর্গম  স্থানের অবস্থান । থানচি বাজার থেকে ৩/৪ ঘন্টার ট্রেক করে ভেলাখুম পৌছানো সম্ভব।

ভেলাখুম জলপ্রপাত কখন যাবেনঃ

 সব সময় যাওয়া যায়। একেক সময় একেক রূপ। তবে বর্ষাকালে পানির প্রবাহ বেশি থাকে আর শীতকালে তা কমে যায় কিন্তু একেবারেই ফুরিয়ে যায় না তাই ভেলাখুম যাওয়ার সবথেকে ভালো সময় হলো বর্ষার পর পর আর শীতের একটু আগে সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর মাস। কেননা ভরা বর্ষায় সাঙ্গু নদীর পানি বিপদসীমার কাছাকাছি থাকায় প্রশাসন থেকে অনেক সময় অনুমতি দেয় না।   

ভেলাখুম জলপ্রপাত কিভাবে যাবেনঃ

ভেলাখুম যেতে হলে আপনাকে প্রথমেই আসতে হবে বান্দরবান জেলায়। তারপর সেখান থেকে থানচি উপজেলা।  থানচি বাজার থেকে দুইভাবে নাটক নাফাখুম যাওয়া যায়।

রুট ১: থানচি=> পদ্মঝিরি=>থুইসাপাড়া=>দেবতা পাহাড়=>ভেলাখুম।

রুট ২: থানচি=> রেমাক্রি=>নাফাখুম=>জিনাপাড়া=>থুইসাপাড়া=>দেবতা পাহাড়=>ভেলাখুম।

প্রথম রুটে থুইসাপাড়া যেতেই সাত-আট ঘণ্টা ট্রেনিং করা লাগে। অনেক সময় রাতের বেলায় ট্রেকিং করা লাগতে পারে। সেই হিসেবে দ্বিতীয়টা তুলনামূলক ভাবে সহজ এবং কম কষ্টকর। তবে আপনি প্রথমে গিয়ে দ্বিতীয় রুটে ফেরত আসতে পারেন।

রাজধানী ঢাকা্র কলাবাগান থেকে শ্যামলী, হানিফ, সেন্টমার্টিন সহ দেশের বিভিন্ন পরিবহন কোম্পানির এসি প্রতিদিন বান্দরবানের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় এবং ঢাকায় ফিরে আসে। জন প্রতি বাস ভাড়া নন-এসি ৫৫০-৭৫০ টাকা। এসি ১২০০-১৫০০ টাকা। রাতের বাসে রওনা দিলে সকাল ৭টার মধ্যে চলে আসবেন বান্দরবানে।

বান্দরবান থেকে থানচিঃ

বান্দরবান শহরের বাসস্ট্যান্ড থেকে এক ঘন্টা পর পর বাস ছাড়ে। জনপ্রতি ভাড়া 200 টাকা। সময় নেবে চার থেকে পাঁচ ঘন্টা। গাড়ি ভাড়া প্রশাসন থেকে 6000 টাকা বেঁধে দিয়েছে। তবে চান্দের গাড়ির স্ট্যান্ডের একটু আগে থেকে নিলে 600 থেকে 1000 টাকা কমে পেতে পারেন।

 থানচি থেকে রেমাক্রিঃ

থানচি বাজারে বিজিবি ক্যাম্প থেকে গাইড এর তালিকা করে দেওয়া আছে। সেখান থেকে আপনাকে একজন গাইড নিতেই হবে। এটি নিয়ে বাধ্যতামূলক। সেদিন ফিরে আসা পর্যন্ত ভাড়া ১৫০০ টাকা। এরপর নাম, ঠিকানা, ফোন নাম্বার, বাসার ফোন নাম্বার, ন্যাশনাল আইডি কার্ড, কোথায় যাবে, কদিন থাকবেন, ইত্যাদি সব কাগজে লিখে থানা এবং বিজিবি ক্যাম্প থেকে অনুমতি নিতে হয় । থানায় সবার গ্রুপ ছবি তুলে রাখবে। সবক্ষেত্রে গাইড আপনাকে সাহায্য করবেন।

মনে রাখবেন, বিকেল ৩টা এরপর আর কোনো অনুমতি দেয়া হয় না। তাই এর আগেই আপনাকে থানচি পৌঁছাতে হবে। নইলে সেদিন থানচি থেকে পরের দিন যেতে হবে। 50 টাকা করে লাইফ জ্যাকেট ভাড়া পাওয়া যায়। বর্ষাকালে সবার জন্য একটা না হলেও অন্তত যারা সাঁতার জানে না তাদের জন্য একটা করে নিয়ে নিবেন।

যাত্রাপথে সাঙ্গু নদীর অপূর্ব রূপ দেখে মুগ্ধ হবেন। এছাড়া পথেই পড়বে পদ্মমুখ, তিন্দু ,বড়পাথর এবং রেমাক্রি ফলস।  নিরাপত্তার কারণে সব জায়গায় থামা যায় না। তবে বড় পাথর এলাকায় নেমে ছবি তুলতে পারবেন। গোসল করে দারুণ মজা পাবেন। আপনার দেহ ঠান্ডা করে দেবে। 

রেমাক্রি থেকে থুইসা পাড়াঃ

রেমাক্রি পৌঁছাতে বিকাল হয়ে গেলে সেই দিন রাতে এখানে থেকে পরের দিন সকালে নাফাখুমের উদ্দেশ্যে যাত্রা করবেন।  রেমাক্রি থেকে ৫০০ টাকা দিয়ে আরো একজন স্থানীয় গাইড নিতে হবে যা থানচি থেকে আসা গাইড ঠিক করে দিবে। এই স্থানীয় গাইড আপনাকে নাফাখুম নিয়ে যাবে। আর সময় থাকলে সরাসরি চয়ে যেতে পারেন নাফাখুম।  

নাফাখুমে কিছুক্ষণ থেকে ছবি তুলে আবার রওনা দিবেন থুইসাপাড়ার দিকে। নাফাখুম থেকে তিন-চার ঘণ্টা ট্রেকিং করে পৌঁছে যাবেন থুইসাপাড়া। রেমাক্রি দিয়ে যেতে বেশি সময় লাগবে না। রাত হয়ে গেলে ভেলাখুমেই রাত কাটাতে পারেন। ভেলাখুম রাত থেকে পরদিন সকালে আরো একজন গাইড নিয়ে রওনা দিবেন দেবতা পাহাড় দেখতে।

পথেই পড়বে থুইসাপাড়া। সেখানে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার ট্রেনিং শুরু করবেন কিছুক্ষণ পর পাহাড়ের চূড়া থেকে নিচের দিকে নামতে হবে। পাহাড় থেকে নামাটা বেশ কষ্টকর এবং বিপজ্জনক। সুতরাং সাবধানে থাকবেন। নিচে নামতে প্রায় এক ঘণ্টার মতো সময় লাগতে পারে। নিচে নেমে  ৫ মিনিট হাঁটলেই পৌঁছে যাবেন ভেলাখুম।

 ভেলাখুম এর পাশেই রয়েছে আমিয়াখুম জলপ্রপাত। তাই আপনার ট্রাভেল প্লান সেভাবেই সেট করুন। ফিরতি পথে প্রায় রাত কাটিয়ে আবার একই পথে পথে থানচি থেকে বান্দরবানে সে ফিরে চলে যান আপনার গন্তব্যে।

কোথায় থাকবেনঃ

নাইখ্যাংছড়ি থাকার তেমন কোন ব্যবস্থা নাই। আদিবাসীদের ঘরই একমাত্র ভরসা। আদিবাসীদের ঘরে পর্যটকদের থাকার ভাল ব্যবস্থা আছে। সব ব্যাপারে গাইড আপনাকে সাহায্য করবে। এ দীর্ঘ যাত্রার পথে রেমাক্রি নাফাখুম যাওয়ার পাড়াগুলোতে সবাই রাত্রিযাপন করে আর সেগুলো যতেষ্ট নিরাপদ।

 কোথায় খাবেনঃ

যাত্রাপথে আদিনাসীদের ঘরেই আপনাকে খাবার খেতে হবে। আদিবাসীদের ঘরে পর্যটকদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা। ভাত, সবজি, ডাল, আলু ভর্তা, মুরগির মাংস ইত্যাদি।  সাথে হালকা শুকনা খাবার যেমন খেজুর, বিস্কুট, চকলেট, চিড়া-মুড়ি, ফল ইত্যাদি নিয়ে যেতে পারেন। এছাড়া বিভিন্ন পাড়ায় কিছু মুদি দোকানে পাবেন। সেখানে বিস্কুট, মিনারেল, পানি ইত্যাদি পাওয়া যায় । যাত্রাপথে আপনাকে কঠিন পরিশ্রম করতে হবে। তাই শরীরে এনার্জি দরকার আছে।

সর্তকতাঃ

খরচ কমাতে চাইলে নতুন কেনাকাটা পরিহার করুন এবং যতো ভোরে সম্ভব ট্রেকিং শুরু করুন। সাঁতার না জানলে এবং বর্ষাকালে গেলে লাইফ জ্যাকেট সাথে রাখুন। পাথুরে পথ পিচ্ছিল। তাই সাবধানে থাকবেন এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক নাই তাই মোবাইল পাওয়ার ব্যাংক চার্জ দিয়ে রাখুন। প্যারাসিটামল, গ্যাসের ঔষধ ইত্যাদি সঙ্গে রাখুন।

Leave A Comment