বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ী দ্বীপ মহেশখালী। শীতের মৌসুমে হাজারো রকমের বিদেশী পাখিতে মুখরিত থাকে।

পর্যটন শহর কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলা পাহাড় সমৃদ্ধ একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। মূল মহেশখালী দ্বীপের সঙ্গে আরও তিনটি ছোট ছোট দ্বীপ নিয়ে মহেশখালী উপজেলা গঠিত। মহেশখালীর তিনটি দ্বীপের মধ্যে একটি হচ্ছে পর্যটন সম্ভাবনাময় সাগরকন্যা সোনাদিয়া দ্বীপ। এটি মহেশখালী উপজেলার কুতুবজোম ইউনিয়ন পরিষদের একটি ওয়ার্ড। কক্সবাজার জেলা সদর থেকে উত্তর-পশ্চিমে ১৫ কিলোমিটার দূরে এই বালুর দ্বীপটি অবস্থিত, যার আয়তন মাত্র ৭ বর্গ কি.মি।

মহেশখালী দ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিম কর্নারে অবস্থিত এই দ্বীপটি মহেশখালী থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছে ছোট-বড় আঁকাবাঁকা খালবিশিষ্ট ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল দ্বারা। দ্বীপের দক্ষিণ, পশ্চিম ও পূর্বে বঙ্গোপসাগর। জানা গেছে, এই দ্বীপে মানুষের স্থায়ী বসবাস শুরু হয় মাত্র ১০০-১২৫ বছর আগে। দ্বীপের বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৮শ’। প্রতি বছর শীতের সময় এই দ্বীপে ৭০ প্রজাতির জলজ ও উপকূলীয় অতিথি পাখির আগমন ঘটে। এটি অতিথি পাখির নিরাপদ বিচরণ ক্ষেত্র। গভীর সুমদ্র বন্দরের জন্য নির্বাচিত কয়েকটি স্পটের মধ্যে সর্বাধিক উপযোগী এই দ্বীপে প্রতি বছর শীত মৌসুমে মাছ আহরণ করে হাজার হাজার টন শুঁটকি উত্পাদন ও প্রক্রিয়াজাত করা হয়। মাছ ধরা এবং মাছ শুকানো এই দ্বীপে বসবাসরত মানুষের জীবিকা নির্বাহের প্রধান মাধ্যম।


সোনাদিয়া দ্বীপকে ঘিরে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের জন্য সরকারি প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। সম্প্রতি সোনাদিয়া দ্বীপ পরির্দশন করে বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের সভাপতি অ্যাডভোকেট এএম জিয়া হাবিব আহসান ও সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট মো. শরীফ উদ্দিন বলেন, সোনাদিয়া দ্বীপকে ঘিরে পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। প্রস্তাবিত গভীর সমুদ্রবন্দর স্থাপিত হলে ঘুরে যাবে বসবাসকারীদের ভাগ্যের চাকা।

সমুদ্র সৈকতঃ

সোনাদিয়া দ্বীপের সমুদ্র সৈকতে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত ও সূর্যোদয় দেখার জন্য ভ্রমণপিপাসু মানুষ দুর্গম এই বিচ্ছিন্ন দ্বীপে হাজির হয়। প্রকৃতির এই অকৃপণ সৌন্দর্য যে কোনো প্রকৃতিপ্রেমিকের মনে প্রশান্তি এনে দেবে। দেখে সৃষ্টি হতে পারে কাব্যিক মনের।
দ্বীপের বেলাভূমিতে হাজার হাজার লাল কাঁকড়ার ঝাঁক আপনাকে হাতছানি দিয়ে ডাকবে, কিন্তু কাছে যেতে না যেতেই অদৃশ্য হয়ে যাবে। তবে এই দ্বীপের সমুদ্র সৈকতের পানিতে নামা জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, কারণ এখানকার সমুদ্র সৈকতে পানির গভীরতা সব সময় বেশি থাকে। সৈকতের বিস্তীর্ণ বেলাভূমিতে ছোট ছোট পাহাড়সদৃশ বালিয়ড়ি আপনার ভ্রমণপিপাসু মনকে নাড়া দিতে পারে। এগুলো তিল তিল করে যুগ যুগ পর এক-একটি বালিয়াড়িতে পরিণত হয়। এই বালির পাহাড় তৈরির রহস্যে যে ‘জাদুকরী উদ্ভিদ’ রয়েছে তাও স্বচক্ষে দেখা যাবে সোনাদিয়া সৈকতে। সগরলতা এবং নিশিন্দার পাতা বাতাসে উড়ন্ত বালিগুলো ধরে রাখার ফলে যুগ যুগ পর বালিয়াড়িতে পরিণত হয়। সৈকতের এই বেলাভূমি ও বালিয়াড়িগুলো সামুদ্রিক কাছিমের ডিম পাড়ার আদর্শ স্থান। ভাগ্য ভালো হলে আপনার চোখে পড়ে যেতে পারে সম্প্রতি সৈকতে ডিম পেড়ে যাওয়া সামুদ্রিক কাছিমের পদছাপ। কাছিমের পদছাপের শেষ প্রান্তে ৮-১০ ইঞ্চি বালুর নিচে ডিম পাওয়া যাবে। দেখে যেতে পারেন কাছিম হ্যাচারি। তাছাড়া দ্বীপের পশ্চিম ও উত্তর প্রান্তে কাদা এলাকায় আপনার চোখে পড়তে পারে এরকম একটি ঝিনুক যেটাতে পিঙ্ক পার্ল বা গোলাপি মুক্তা আছে। দ্বীপের বেলাভূমিতে কাঁকড়ার কারুকাজ দেখে মনে হতে পারে এগুলো প্রাচীন কোনো শিল্পীর হাতের কাজ। তাছাড়া সোনাদিয়া দ্বীপের এই বিস্তীর্ণ বেলাভূমিতে লুকিয়ে আছে ইউরেনিয়ামসহ বেশ কয়েকটি মূল্যবান খনিজ পদার্থ।



ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল :

অপরূপ সুর্ন্দযের লীলাভূমি সোনাদিয়া দ্বীপের উত্তর-পশ্চিমে প্রায় ৩ হাজার হেক্টর এলাকাজুড়ে বিভিন্ন ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদসহ প্রায় ২৭ প্রজাতির প্যারাবন উদ্ভিদ সমৃদ্ধ সবুজ অরণ্য আছে। এই দ্বীপের বিস্তীর্ণ প্যারাবনে রয়েছে সাদা বাইন, কালো বাইন, হারগোজা কেউড়া, নুনিয়া ইত্যাদি ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ। সোনাদিয়া প্যারাবন, কাদাময় এলাকা, আঁকাবাঁকা খাল ও মোহনায় বিভিন্ন প্রজাতির হরেক রকম পাখি, মাছ ও অমেরুদণ্ডী প্রাণীর আবাসস্থল। দ্বীপের আশপাশের জলে ৮০ প্রজাতির মাছ বিচরণ করে। তার মধ্যে বাটা, কোরাল, তাইল্যা দাতিনা, কাউন, পোয়া ইত্যাদি প্যারাবনের মধ্যে বয়ে যাওয়া খালে পাওয়া যায়। এছাড়া সোনাদিয়া দ্বীপে ১৯ প্রজাতির চিংড়ি মাছ দেখা যায়। দ্বীপের খাল ও তীরবর্তী সমুদ্র এলাকায় ইরাওয়াদি ডলফিন, বটলনোস ডলফিন পরপইস এবং পাখি মাছ দেখা যায়। পানির ওপর ডানা মেলে ৩০-৩৫ সেকেন্ডের জন্য উড়তে থাকা এই মাছ ভ্রমণপিপাসু মানুষের নজর কাড়বে, এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। দ্বীপের আঁকাবাঁকা খালে নৌকা দিয়ে যাতায়াত করার সময় দ্বীপের সৌন্দর্যগুলো আপনার চোখে পড়বে। 

কিভাবে যাবেনঃ

মহেশখালী যেতে হলে আগে আপনাকে যেতে হবে কক্সবাজার। সড়কপথে ও আকাশপথে ঢাকা থেকে সরাসরি কক্সবাজার যাওয়া যায়। এ পথে গ্রিন লাইন, সৌদিয়া, সোহাগ, হানিফ, টি আর ইত্যাদি পরিবহন সংস্থার এসি এবং নন-এসি বাস চলাচল করে। ভাড়া ১৬০০-২০০০ টাকা। কক্সবাজার কলাতলী সুগন্ধা বা লাবণী পয়েন্ট থেকে যেতে হবে ৬ নং জেটি ঘাট। সেখান থেকে যেতে হবে মহেশ খালী ১ নং জেটি ঘাট। স্পিডবোটের ভাড়া জন প্রতি ৭৫ টাকা। এছাড়া নৌকা বা লঞ্চে করেও অল্প খরচে মহেশখালী যাওয়ায়। জন প্রতি ভাড়া ৩০ টকা।

কোথায় থাকবেনঃ

মহেশখালীতে থাকার জন্য ভালো মানের কোন জায়গা নেই। তবে কক্সবাজার এসে মনের মতো হোটেলে রাত কাটাতে পারবেন। খাওয়ার জন্য মোটামুটি টাইপের কয়েকটা হোটেল আছে।

Leave A Comment