মহারাজা প্রথম ধর্মমাণিক্যের ধর্মসাগর দীঘি। একসময় মানুষের জলের কষ্ট নিবারক এখন মানুষের মনের কষ্ট নিবারক।

ধর্মসাগর, প্রায় পৌনে ৬০০ বছর আগে ত্রিপুরার অধিপতি মহারাজা প্রথম ধর্মমাণিক্য এটি খনন করেন। কুমিল্লা শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত বিশাল এ জলাধারটি সে সময় তৈরি করা হয়েছিল মূলত এ অঞ্চলের মানুষের জলের কষ্ট নিবারণের উদ্দেশ্যে। প্রাচীন এ দীঘি শুধু ইতিহাসের দিক থেকেই পুরনো নয়, প্রাকৃতিক শোভা আর অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমিও।

ধর্মসাগরের উত্তর কোণে রয়েছে রানীর কুঠি, নজরুল ইনস্টিটিউট। পূর্বদিকে কুমিল্লা জিলা স্কুল, কুমিল্লা স্টেডিয়াম আর পশ্চিম পাড়ে রয়েছে বসার ব্যবস্থা ও ওয়াকওয়ে। স্থানীয় অধিবাসী ছাড়াও বিপুল সংখ্যক পর্যটকের আগমন ঘটে এ দীঘিতে। দীঘিপাড়ের সবুজ বড় বড় গাছের সারি ধর্মসাগরকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা। তাছাড়া শীতকালে ধর্মসাগরে প্রচুর অতিথি পাখির আগমন ঘটে। জরুল ইনস্টিটিউট, রানীর কুঠির— ঠিক ধর্মসাগরের পাড়ে। তার ঠিক উত্তরে নগর উদ্যান।

দীঘির উত্তরপাড়ে টিলার ওপর রয়েছে রানীর কুঠির এবং ধর্মসাগরকে আরো সাজিয়ে তুলতে এর উত্তর পাশে তৈরি করা হয়েছে নগর উদ্যান। ধর্মসাগরে দুটি নৌকা রয়েছে যাতে করে ভ্রমণবিলাসীরা নৌকায় চড়ে আনন্দ উপভোগ করতে পারেন। কর্মময় জীবনে হাঁপিয়ে ওঠা মানুষেরা প্রকৃতির খুব কাছাকাছি থেকে একটু স্বস্তি পেতে রোজই এখানে ছুটে আসেন। স্বাস্থ্য সচেতনরা প্রতি সকাল ও সন্ধ্যায় ধর্মসাগরের পশ্চিমপাড়-সংলগ্ন সড়কটিতে হেঁটে বেড়ান নির্মল বাতাসের প্রত্যাশায়। এখানে এলে নাগরিক জীবনের যাবতীয় ক্লান্তি ও যন্ত্রণা মুছে যায় মুহূর্তেই।

শুধু কুমিল্লা নয় বাংলাদেশের মধ্যে বিদ্যমান প্রাচীন ঐতিহাসিক কয়েকটি দীঘির মধ্যে কুমিল্লার ধর্মসাগর একটি। স্ফটিকতুল্য স্বচ্ছ ও নির্মল পানির জন্য এটি অতুলনীয়।দেশী-বিদেশী পর্যটকদের কাছে যেমন স্বর্ণালি আকর্ষণ, তেমনি প্রমোদ বিহার আর নিভৃত অবকাশ যাপনের নিকেতন। এছাড়া শিশুদের জন্য রয়েছে নগর উদ্যান। বিভিন্ন দিবস-পূজা পার্বনে মানুষের ঢল নামে সাগরের দুই পাড়ে। ওই দিনগুলোয় মানুষের উপস্থিতি মিলনমেলায় পরিণত হয় কুমিল্লা ধর্মসাগরের দুই পাড়।গল্প আর ইতিহাস অন্বেষণ করতে করতে এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।

ঘাটে বাধা নৌকায় চড়ে বসলাম সবাই। ঢেউ কেটে চলছে আমাদের নৌকা। দীঘির নাম যেমন ধর্মসাগর, তেমনি তার ঢেউগুলোও সাগরের মতো অনেকটা উত্তাল। বেশ উপভোগ করলাম আমরা সবাই। গানে-আড্ডায় মিলে গেলাম গোধূলি লগ্নে। সন্ধ্যার আলো ঝলমলে ধর্মসাগর দেখতে আরো আকর্ষণীয়, আরো মন ভোলানো। আমাদের মতো আরো দর্শনার্থীর পদভারে ধর্মসাগর ছিল মুখরিত।

নৌবিহার, আড্ডা গান শেষে রাতের খাবার। তার পর রাত্রি যাপনে চলে গেলাম কুমিল্লা ক্লাবে। পরিষ্কার-পরিপাটি খুব সুন্দর একটি থাকার জায়গা। পরের দিন লালমাই পাহাড়, শালবন বিহার আর ওয়ারসিমেট্রি পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে একটি চমত্কার ভ্রমণের সমাপ্তি ঘটে।কীভাবে যাবেন: সায়েদাবাদ থেকে তিশা, উপকূল অথবা এশিয়া লাইন পরিবহনে কুমিল্লার শাসনগাছা।

ভাড়া ২০০ টাকা থেকে ২৭০ টাকা। তার পর রিকশা অটোতে ভাদুরতলা/ধর্মসাগর। ভাড়া পড়বে ১৫ থেকে ২০ টাকা।কোথায় থাকবেন: কুমিল্লা ক্লাব, কুমিল্লা সিটি ক্লাবসহ বেশকিছু হোটেল ও গেস্ট হাউজ রয়েছে এখানে। এসি কিংবা ননএসি সব ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে। দুজনের কক্ষে প্রতি রাত্রি যাপন খরচ হবে ১ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা।

Leave A Comment