রহস্যময় শহর মাচুপিচু। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এ শহরটির উচ্চতা প্রায় ২ হাজার ৪০০ মিটার বা, ৭ হাজার ৮৭৫ ফিট।

পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি ইনকাদের গড়ে তোলা শহর মাচুপিচু। ১৪৫০ সালে ইনকারা মাচুপিচু শহরটি নির্মাণ করে। একশ বছর পর স্প্যানিশদের আক্রমণে ইনকাদের নির্মিত সব শহর ধ্বংস হয়ে গেলেও তারা এই শহরটির সন্ধান পায়নি। মাচুপিচু শহরটি ধ্বংসের হাত থেকে বেঁচে যায়।

মাচুপিচু

পেরুর ৫০ মাইল উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত আন্দিজ পর্বতমালার কোরডিংয়েরা দে ভিলকাবাম্বা এলাকায় অবস্থিত প্রাচীন ইনকা সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ মাচুপিচু শহর। বলা হয়ে থাকে, মাচুপিচু হয়তো ইনকা সভ্যতার সব থেকে পরিচিত নিদর্শন। স্পেনীয় উচ্চারণে শহরটির নাম মাচুপিচু হলেও, অনেকেই এর নাম উচ্চারণ করেন মাচুপিচু হিসেবে, যার অর্থ ‘পুরনো চূড়া’। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এ শহরটির উচ্চতা প্রায় ২ হাজার ৪০০ মিটার বা, ৭ হাজার ৮৭৫ ফিট। ১৯৮১ সালে একে পেরুর সংরক্ষিত ঐতিহাসিক এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং ইউনেসকো ১৯৮৩ সালে এটিকে তাদের বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। বর্তমানে এটি বিশ্বের সাতটি নতুন বিস্ময়েরও একটি।

নির্মাণের ইতিহাস রয়েছে অজানা

দক্ষিণ আমেরিকার একটি প্রাচীন সভ্যতা হলো ইনকা। আর এ সভ্যতার অনন্য নিদর্শন মাচুপিচু নির্মিত হয়েছিল ১৪৫০-১৪৬০-এর মাঝামাঝি সময়ে। তখন ইনকা সভ্যতার স্বর্ণযুগ চলছিল। এ সময় ইনকা সভ্যতায় ছিল দুজন বিখ্যাত শাসকের শাসনামল। তারা হলেন পাচাকুটেক ইনকা ইউপানকি এবং টুপাক ইনকা ইউপানকি। তবে এ শহর আসলে ঠিক কী কারণে নির্মাণ করা হয়েছিল, এটি নিয়ে নানা ধরনের মতবাদ রয়েছে। কারও মতে, মাচুপিচু নির্মাণ করা হয়েছিল তীর্থস্থান হিসেবে। আবার অবকাশযাপন কেন্দ্র কিংবা কয়েদখানার জন্য বানানো হয়েছিল সেই মতবাদও বেশ জনপ্রিয়। তবে ঠিক কী কারণে এ শহর নির্মাণ করা হয়েছিল, সেটি আর জানার সুযোগ নেই। সেটি রহস্যই রয়ে গেছে।

১৪০ স্থাপনা

প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, মাচুপিচুর শহর ব্যবস্থা তিনটি বড় বিভাগে বিভক্ত ছিল, এগুলো হট পবিত্র এলাকা, জনসাধারণের এলাকা এবং পুরোহিত ও অভিজাত শ্রেণির এলাকা। আবিষ্কারের পর সেখানে দেখা গেল ১৪০টি স্থাপনা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কিছু উপাসনালয় আবাসিক ভবনসহ আরও নানা কিছু, যেগুলোর আসলে নাম দেওয়া যায়নি। পুরো শহরে রয়েছে ১০০টিরও বেশি সিঁড়ি। এখানে আরও রয়েছে প্রচুর ঝরনা। যেগুলো পাথর কেটে তৈরি করা আর সেগুলো ছোট খালের মাধ্যমে একটির সঙ্গে আরেকটিকে সংযুক্ত করা হয়েছে। ধারণা করা হয়, মূলত সেচকাজের জন্যই এগুলো তৈরি করা হয়েছিল। গবেষকরা প্রমাণ পেয়েছেন, এই সেচব্যবস্থা ব্যবহার করে একটি ঝরনা থেকে পানি প্রতিটি বাড়িতে সঞ্চালনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

পাথরের দেয়াল

এই স্থাপনাগুলোর দেয়াল পাথর দিয়ে নির্মাণ করা। কিছু কিছু ভবনের দেয়াল তৈরিতে কোনো ধরনের চুন-সুরকির মিশ্রণ ব্যবহার করা হয়নি। একটি পাথরের সঙ্গে আরেকটি জোড়া দিয়ে নির্মিত এই পদ্ধতিকে বলে ধংযষধৎ। আর এই পদ্ধতিতে নির্মাণ কৌশলে ইনকারা খুবই দক্ষ ছিল। এই পদ্ধতিতে পাথরের খণ্ড এমন নিখুঁতভাবে কাটা হতো, যেন কোনো ধরনের সংযোগকারী মিশ্রণ ছাড়াই পাথরগুলো খাঁজে খাঁজে শক্তভাবে একটার ওপর আরেকটা বসে যায়। ইনকারা পাথরের এই নির্মাণ পদ্ধতিতে পৃথিবীর সেরাদের সেরা ছিল।

তাদের নির্মিত পাথরের দেয়ালগুলোর জোড়া এতই নিপুণ, একটা পাতলা ছুরির ফলাও সেগুলোর ভেতর দিয়েও প্রবেশ করানো যায় না। শুধু খাঁজে খাঁজে পাথর বসিয়ে তৈরি স্থাপনা অনেক বেশি ভূমিকম্প প্রতিরোধ করতে পারে। আর সে কারণেই ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা হওয়া সত্ত্বেও মাচুপিচুর দেয়ালগুলো এখনো টিকে আছে। তা ছাড়া এর দরজা এবং জানালাগুলো অসমচতুর্ভুজ আকৃতির এবং নিচ থেকে ওপরে ক্রমে ভেতরের দিকে হেলানো। মাচুপিচুর দেয়ালগুলো ওপর থেকে নিচে একদম সোজা নয়; বরং একসারি থেকে অন্যসারি কিছুটা হেলানো এবং এভাবে দেয়ালগুলোর ভারসাম্য রক্ষা করা হয়েছে।

ইনকা সভ্যতায় চাকার ব্যবহার দেখা যায় না। তাই কীভাবে এত বিশাল পাথরের খণ্ডগুলো পাহাড়ের চূড়ায় তোলা হয়েছে, সেটাও এক রহস্য।

পর্যটকের আধিক্যে ঝুঁকি

মাচুপিচু এখন একটি ঐতিহ্যবাহী স্থান। আর এখন সেটা সবার কাছে হয়ে উঠেছে পর্যটনের সবচেয়ে জনপ্রিয় জায়গা। প্রতি বছরই মাচুপিচুতে পর্যটক সমাগম বাড়ছে। ২০১৮ সালের হিসাব অনুযায়ী ওই বছর মাচুপিচুতে পর্যটনের সমাগম ছাড়িয়েছে ১৫ লাখ। অতিরিক্ত জনাধিক্যের কারণে মাচুপিচু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন গবেষক ও বিজ্ঞানীরা।

তারা বলছেন, সামনে পর্যটকের সমাগম আরও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে এবং তা এই পুরাকীর্তির অস্তিত্বের জন্য মারাত্মক হুমকির সৃষ্টি করবে। বর্তমানে মাচুপিচুর ওপর দিকে কোনো ধরনের উড়োজাহাজ চালানো নিষিদ্ধ। ইউনেসকো একে বিপন্ন বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার চিন্তাভাবনা করছে।

অতিরিক্ত লোকসমাগমের ফলে মাচুপিচুর বেশ ক্ষতি হয়েছে এরই মধ্যে। ২০০০ সালের সেপ্টেম্বরে মাচুপিচুর শতাব্দী প্রাচীন ইন্তিউয়াতানা পাথর বা ‘সূর্যঘড়ি’-এর ওপর এক হাজার পাউন্ড ওজনের ক্রেন পড়লে এটি

মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তা ছাড়া ঔ. ডধষঃবৎ ঞযড়সঢ়ংড়হ-এর তত্ত্বাবধানে একটি বিজ্ঞাপন এজেন্সি এখানে বিজ্ঞাপনের চিত্রায়ণের সময় এই দুর্ঘটনাটি ঘটে।

বিতর্ক

যিনি এটা আবিষ্কার করেছিলেন তার সঙ্গে প্রথমদিকে পেরুর সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক ছিল। তাই পেরুতে ঘুরে বেড়াতে বা পুরাতাত্ত্বিক সামগ্রী ধার করার অনুমতি পেতে কোনো সমস্যা হয়নি। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি যখন ফেরেন তখন সঙ্গে করে বেশ কিছু পুরাকীর্তির নিদর্শন নিয়ে আসেন। তবে সেটা এই উদ্দেশ্যে যে পেরুর সরকার সেগুলো ফেরত না চাওয়া পর্যন্ত তা ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে থাকবে। দ্বন্দ্বটা শুরু হয় এখান থেকেই। এক পত্রিকার রিপোর্টে বলা হয় মাচুপিচু থেকে বিংহাম যেগুলো নিয়ে গেছেন সেগুলো দিয়ে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় প্রদর্শন করে মুনাফা লাভ করছে। এ ঘটনার পর পেরুর নতুন প্রেসিডেন্ট আলান গার্সিয়া একটি প্রতিনিধিদল নিয়োগ দেন যাতে করে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে নেওয়া যায় এবং কোনোরকম আইনি জটিলতা ছাড়াই এই সমস্যার সমাধান করা যায়।  পরবর্তী সময়ে প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শনসমূহের হস্তান্তরের ব্যাপারে পেরু এবং ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় একটি ঐকমত্যে পৌঁছায়। ইয়েল মাচুপিচু থেকে অপসারিত সব নিদর্শনের ওপর পেরুর স্বত্ব¡ স্বীকার করে। এবং পেরু সরকার এবং ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় যৌথভাবে ভ্রাম্যমাণ প্রতœতাত্ত্বিক প্রদর্শনীর আয়োজন করবে এবং কোস্কো শহরে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরামর্শে একটি জাদুঘর ও গবেষণাগার নির্মিত হবে বলেও সিদ্ধান্তে পৌঁছায়।

লুকানো ছিল ৪০০ বছর

১৬০০ শতাব্দীতে ইনকা শাসক যখন পরাজিত হয়, তখন পেরু দখল করে নেয় স্প্যানিশরা। সে সময় ইনকাদের রাজধানী ছিল কোস্কো। আর এই কোস্কো থেকে মাত্র ৮০ কিমি দূরেই অবস্থিত ছিল এই মাচুপিচু শহরটি। কিন্তু পেরু দখল করা হলেও এই মাচুপিচুর কথা তারা জানত না। এত ওপরের এ শহরের হদিস তারা পায়নি কোনোভাবেই। কিন্তু শহরের মানুষ কীভাবে নাই হয়ে গেল, সেটিও আরেক রহস্য। এটি নিয়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় যে মতবাদ, সেটি হলো গুটিবসন্তের আক্রমণে এখানকার সব মানুষ মারা যায়। আর শহরটি একেবারে জনমানবহীন থাকায় ঘন জঙ্গলে ঢাকা পড়ে। স্পেনের আক্রমণের পর কেটে যায় আরও ৪০০ বছর। আর তত দিন এ শহরটি লুকিয়ে ছিল বাইরের পৃথিবীর মানুষদের কাছ থেকে। তবে কিছু স্থানীয় আদিবাসী সেটি সম্পর্কে জানত। সেখানে তাদের যাতায়াতও ছিল। অবশেষে ১৯১১ সালে আমেরিকান আর্কিওলজিস্ট বা পুরাতত্ত্ববিদ হিরাম বিংহাম এটিকে দুনিয়ার সামনে নিয়ে আসেন। তারপর থেকে মাচুপিচু পর্যটকদের কাছে একটি আকর্ষণী দর্শনীয় স্থান হয়ে উঠেছে। ১৯১১ সালে এ শহর আবিষ্কারের পর সেখানে কিছু প্রাচীন মমিও পাওয়া গিয়েছিল।

Leave A Comment